MVP (Minimum Viable Product-নূন্যতম টেকসই পণ্য) এবং ডিজাইন

লিখেছেন: Hasan Sharif || Product Designer || তারিখঃ 15 Jan, 2022


ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সফলতা অর্জন

 

MVP ধারণাটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে খুব বেশিদিন হয় নি। এই পরিভাষাটি প্রথম সংজ্ঞায়িত করেছেন ফ্র্যাঙ্ক রবিনসন কিন্তু জনপ্রিয় করে তুলেছেন প্রোডাক্ট ডিজাইন জগতের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব — স্টিভ ব্ল্যাঙ্ক, একজন ধারাবাহিক উদ্যোক্তা এবং শিক্ষক, অপরজন হলেন এরিক রাইস, Lean Startup এর অগ্রদূত যাকে বলা হয়।

এই আলোচনায় যখনই “প্রোডাক্ট” অথবা, “পণ্য” শব্দটি ব্যবহার করা হবে, MVP-কেই নির্দেশ করে করা হবে।

MVP আসলে কি?

নতুন কোম্পানিতে, অর্থাৎ, একটি স্টার্টআপে ডিজাইনার (UX/PRODUCT DESIGNER) হিসেবে যারা কাজ করেন, MVP এর ব্যাপারে উনাদের ভাল মানের জ্ঞ্যান থাকাটা জরুরী। একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ডিজাইনারদেরও এই বিষয়ে অবগত থাকতে হবে যা পরে ছোট্ট করে আলোচনা হবে। MVP (Minimum Viable Product) একটি পণ্যের আদর্শ অবস্থা। শুরুতে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি বা, ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টায় থেকে বাজারজাতকরণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই এর লক্ষ্য। পণ্যটি যাতে বাজারে সফল হয় তা নিশ্চিত করতে পাশাপাশি কাজ করে যেতে হয়।

এক কথায়ঃ নূন্যতম ব্যাসিক কিছু ফিচারসহ বাজারে পণ্যটি উন্মোচন করা এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুরো ভার্সনটি বাজারে নিয়ে আসা। বোনাস হিসেবে কাস্টমার ফিডব্যাক বা, ভ্যালু অর্জন করা যা পরবর্তী ডেভেলাপমেন্টে কাজে লাগবে।

MVP প্রসেসের ক্ষেত্রে “ভ্যালু” হল অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারেঃ

একজন চালকের কাছে শুধু চাকার কোনো দাম (ভ্যালু) নেই কিন্তু একটি পূর্ণ সাইকেলের দাম আছে। অর্থাৎ, চালকের কাছে সাইকেলের দাম আছে কারণ তিনি এর মাধ্যমে কোথাও যেতে পারবেন, ইনকাম করতে পারবেন কিন্তু পণ্য হিসেবে শুধু সাইকেলটি তৈরীর কৌশল কিংবা এর আলাদা কোনো অংশ চালকের কাছে ভ্যালুলেস। উদাহরণটি সামনে ক্লিয়ার হবে।

সাধারণত একটা কোম্পানির ডিজাইন-টু-ডেভেলাপমেন্ট প্রসেসের সাথে জড়িত পুরো টীমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল প্রোডাক্টের কাস্টমার ঠিক কোন শ্রেণীর হবে তা নির্ধারণ করা, অর্থাৎ User Group Identify করা। এই সিলেকশান প্রসেসটি যথাযথ ধাপসমূহ পার করে সম্পন্ন করতে হবে যাতে নির্ধারিত শ্রেণীটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে দ্রুত সময়ে প্রোডাক্টটির ব্যবহার আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে। তাছাড়া, শ্রেণীটিকে প্রোডাক্টটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নমনীয় হতে হবে যাতে সদ্য উন্মোচিত প্রোডাক্টটির প্রাইমারি ভুলগুলোর (ERROR) প্রতি সহনশীল হতে পারে। জেনে রাখা দরকার, নির্ধারিত শ্রেণীটি যদি TOP-NOTCH প্রযুক্তির সাথে খুব বেশি অভ্যস্ত হয়ে থাকে, তাহলে সে শ্রেণীটি থেকে সহনশীল আচরণ আশা করা বোকামি হবে। যেহেতু সিলেক্টেড শ্রেণীটি থেকে প্রোডাক্টের ফিডব্যাক সংগ্রহ করা হবে আর পরবর্তী ডেভেলাপমেন্টে কাজে লাগানো হবে, তাই শ্রেণীটি নির্ধারণের আগে আমাদের উপরোক্ত বিষয়সমূহ অবশ্যই মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে।

এভাবে MVP-কে একটি বৃহৎ প্রক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ বলা যায় যা নতুন পণ্য উৎপাদনে এবং সে-ই পণ্যটি পরবর্তীতে গ্রাহকদের কাছে সফলভাবে পৌঁছে দিতে সক্রিয় থাকে। প্রসেসের শুরুতে ধরে নেয়া হয়, প্রোডাক্ট কনসিউমারদের কাছে পৌঁছানোর পর মূল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এটি আরো একটি র‍্যাপিড প্রসেসের মধ্য দিয়ে (Rapid Iteration Process) অতিবাহিত হবে যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে-যার প্রধান উদ্দেশ্য প্রোডাক্টকে আরো রিচ করা। অথবা ধরে নেয়া হয়, প্রোডাক্ট কনসিউমারদের কাছে পৌঁছানোর পর প্রতিক্রিয়া (Customers Feedback) হিসেবে পণ্যটি যদি অব্যবহারযোগ্য কিংবা, অবাঞ্ছিত রুপে প্রকাশ পায়, তাহলে MVP এর মূল প্রসেসটিকে স্থগিত করতে হবে।

এরিক রাইস বলেন, “আপনি যেহেতু নিজস্ব MVP তৈরী করার পরিকল্পনা করেছেন, তাহলে এতে এমন ফিচার, প্রসেস বা এফোর্ট দেয়া বাদ দিন যা আপনার গবেষণার পথে অবদান রাখছে না — আর এটিকেই যথেষ্ট মনে করুন।”

মূল ছবিটির স্বত্বাধিকারীঃ জুসসি পাসানেন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (বাংলায় ঈষৎ পরিবর্তিত)।

MVP (Minimal Viable Product — নূন্যতম টেকসই পণ্য): Build a slice across, instead of one layer at a time.

MVP প্রসেসটিতে মৌলিকভাবে কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান; এগুলো শুধু ডিজাইন টীমে প্রয়োগ হয় না, একটি কোম্পানিতে বিশদভাবে এবং যে কোনো বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও (যদি থাকে) প্রয়োগ হয়ে থাকে।

  • অনেক বেশি পরিমাণ রিসোর্স ব্যবহার না করে শুধু মৌলিক কিছু ফিচার যুক্ত করার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের (MVP) প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কিনা — আপনার বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে তা যাচাই করতে পারবেন।
  • সামগ্রিকভাবে গোটা টীমকে কাস্টমারের চাহিদা/প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত গবেষণায় তৎপর রাখতে পারবেন। পাশাপাশি কাস্টমারের কাছে পণ্য হস্তান্তরের (Delivery) উদ্দেশ্যে র‍্যাপিডলি প্রসেসটি পুনরাবৃত্তি (Rapid Iteration Process) হতে থাকবে।
  • পণ্য উন্মোচনের লক্ষ্যে শুধুমাত্র মৌলিক কিছু ফিচার যুক্ত করে টীমের মাধ্যমে যে সময়গুলো অপচয় হয় তা আপনি কমিয়ে আনতে পারবেন।
  • মার্কেটপ্লেসে দ্রুত প্রবেশ করতে পারবেন এবং এই প্রসেসে তাত্ত্বিকভাবে, পণ্যের বিক্রয় সূচনার মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি করতে পারবেন সুদীর্ঘ সময় পর পণ্যের চূড়ান্ত সংস্করণ (Final Version) থেকে আসা আয় থেকেও দ্রুত উপায়ে।
  • যদি অন্যান্য কোম্পানিরাও আপনার টার্গেট মার্কেটে প্রবেশের জন্য মনস্থ করে, তাহলে এই পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক মার্কেটের (Competitive Advantage) সুবিধাও আপনি পেতে পারেন।

সহজ ভাষায়, MVP এর সুবিধাগুলো অর্জন করতে আপনাকে যেটা অনুসরণ করতে হবে তা হল —আপনি যে পণ্যটি উৎপাদন করতে চাচ্ছেন তা হবে একদমই সরল মানের (SIMPLEST) পণ্য যা দিয়ে আপনি যাচাই করতে পারবেন কাস্টমারদের চাহিদা পূরণের জন্য পণ্যটি আরো আগে উৎপাদন করা উচিত ছিল কিনা।

মূল ছবিটির স্বত্বাধিকারীঃ রোমান পিচলার। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (বাংলায় ঈষৎ পরিবর্তিত)।

MVP মানেই কিন্তু আপনাকে সবকিছু প্রথম প্রচেষ্টায় পেয়ে যেতে হবে এমন না, সবকিছু পেতে হলে একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তিও করতে হতে পারে।

MVP: যাচাই-বাছাই করার পদ্ধতি

ওয়েবসাইটস এবং এপ্লিকেশান্স (Websites & Applications)

একটি পণ্যের চাহিদা কতটুকু আছে তা যাচাই করার জন্য অন্যতম সহজ পন্থা হলো সে পণ্যের একটা মক ওয়েবসাইট তৈরী করা যেখানে পণ্যের কি কি সেবা থাকছে তা উল্লেখ থাকবে আর কাস্টমারদের সে পণ্যের ব্যাপারে “আরো তথ্য জানার” আগ্রহ কতটুকু আছে তা যাচাই করতে “click for more information/learn more” লেখাসহ একটি বাটন/লিংক থাকবে। এই বাটনে ক্লিক কতবার পড়েছে তার উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা যাবে সে পণ্যের চাহিদা কতটুকু। একই কাজটি একটি সিম্পল মোবাইল এপের মাধ্যমেও করা যেতে পারে।

সেবা (Services)

আপনি যদি একটি সেবামূলক পণ্য বিক্রয়ের উদ্যোগ নেন (যেমন, shebaxyz), তাহলে এটি যাচাইয়ের সহজতর পন্থা হলো এই সেবাটিকে পরিপূর্ণভাবে কাস্টমারদের কাছে আগেভাগে হস্তান্তর না করে কোনো একজন কাস্টমারের কাছে পরীক্ষামূলকভাবে সেবাটি দিয়ে যাচাই করে দেখা যে, সেবাটি কিনে নিতে কাস্টমারটি ঠিক কি পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে আগ্রহী। এই প্রক্রিয়াটি কয়েকবার করে হতে পারে যাতে যথাযথ ফলাফল বের করা যায়।

নতুন ফিচারস

মার্কেটে বিদ্যমান কোনো পণ্যে নতুন ফিচার যুক্ত করার আগে সে ফিচার সম্পর্কে পণ্যটির ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। সেই সাথে “click for more information/learn more” লেখাসহ একটি বাটন/লিংক যুক্ত করে দিলে আরো ভাল ফলাফল এনে দিতে পারে। এই বাটন/লিঙ্কটিতে ক্লিকের মাধ্যমে কাস্টমার ফিচারটির বর্তমান অবস্থা জানতে পারবে, যা এভাবে লেখা থাকতে পারে- “This feature is under construction”। আর এভাবেই এই বাটন/লিংকটিতে কতবার ক্লিক পড়েছে তা একটি যুক্তিসঙ্গত বিচারবুদ্ধি তৈরীতে সাহায্য করবে এই বিষয়ে যে, ফিচারটির চাহিদা কতটুকু আছে।

ইমেইজটি apple.com থেকে নেয়া হয়েছে।

শেষ অংশঃ MVP-বাস্তব উদাহরণ

Uber, Pathao, Instagram এমনকি iPhone — এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে কমন বিষয়টা কি? যুগান্তকারী ব্যবসায়িক আইডিয়া, দুর্দান্তসব সফলতার পরেও কোম্পানিগুলো কিন্তু MVP দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল।

Uber এর প্রথম ভার্সন (সোর্সঃ businessinsider.com)

২০০৯ সালে উবার প্রথম তাদের সেবা শুরু করে শুধুমাত্র আইফোন ব্যবহারকারীদের দিয়ে আর এস.এম.এস ফ্যাসিলিটি, তাও শুধু আমেরিকার সান ফ্রান্সিস্কোতে। এরপর তারা প্রমাণ করে যে, রাইড-শেয়ারিং আইডিয়ার চাহিদা অবশ্যই আছে। খুব কম বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা MVP এর সুবিধা পেয়েছিলো। MVP ব্যবহারকারীদের থেকে পাওয়া তথ্য এবং প্রতিক্রিয়াগুলো দ্রুত এগিয়ে যেতে তাদের সাহায্য করেছিলো।

Uber এর বর্তমান ভার্সন (সোর্সঃ engadget.com)

পুরো আর্টিকেলটিকে বাংলায় গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি Interaction Design Foundation এর ওয়েবসাইটে MVP নিয়ে লেখা আর্টিকেলটি থেকে সাহায্য নিয়ে। পাঠকদের কিছু শব্দের বাংলা বুঝতে কঠিন লাগতে পারে তাই বিকল্প হিসেবে ইংরেজী ব্যবহার যথেষ্ট মনে করেছি (অফিসিয়ালি যেসকল শব্দ ইংরেজীতে ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত)। এর পাশাপাশি আরো কয়েকটি সাইট থেকে সাহায্য নিয়েছি যা রেফারেন্সে যুক্ত করা আছে।

মূলত বাংলাদেশের ডিজাইনিং কমিউনিটির ডেভেলাপমেন্টের সুবিধার্তে আমার এই চেষ্টা। ডিজাইনিং পেশায় প্রোডাক্ট আর মার্কেট এনালাইসিস, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলোর গুরুত্ব না বোঝার কারণে দেশীয় ডিজাইন প্যাটার্নগুলো আন্তর্জাতিকমানের সাথে সমানভাবে এগিয়ে যেতে বিপাকে পড়ছে। একটি ডিজাইন সুন্দর এবং আকর্ষণীয় হলেই হয় না, যে প্রোডাক্টের জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে আর ডিজাইনার যে কৌশলে ডিজাইন করছেন — এই দুটো বিষয় সামনের দিনগুলোর জন্য যদি ফলদায়ক (Productive for future development) না হয়, তাহলে আদতে ডিজাইনের মূলনীতির আলোকে ঐ ডিজাইনকে ডিজাইন বলা যায় না, কিছু কালার আর শেইপের সমষ্টি শুধুমাত্র। আশা করি, এই লেখাটি তা বুঝতে সাহায্য করবে।

আপনার সময়ের জন্য ধন্যবাদ। জাযাকাল্লাহু খাইরান।

References:

  1. https://www.interaction-design.org/literature/article/minimum-viable-product-mvp-and-design-balancing-risk-to-gain-reward
  2. https://medium.com/datadriveninvestor/design-thinking-turning-minimum-viable-into-most-valuable-product-1891f8465e1e
  3. https://www.quora.com/What-is-Ubers-minimum-viable-product